এ খনিতে ৬২ দশমিক ৫ কোটি টন আকরিক লোহার মজুদের কথা জানানো হয় তখন। এমনকি লোহার পাশাপাশি মূল্যবান কপার, নিকেল ও ক্রোমিয়াম থাকার বিষয়টিও উঠে আসে জিএসবির জরিপে। এ খনি থেকে দেশে ৩০ বছরের লোহার কাঁচামাল সরবরাহের সম্ভাবনার কথাও জোর দিয়ে জানানো হয়। তবে খনি আবিষ্কারের প্রায় সাত বছর অতিবাহিত হলেও খনিটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে না—এমন ফলাফলের পর খনি এলাকায় নতুন করে আর কোনো তৎপরতা দেখায়নি জিএসবি ও পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলা ও বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) অন্তত দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লোহার খনি মজুদের বিস্তৃত ধারণা পেতে পরবর্তী সময়ে জার্মান প্রতিষ্ঠানের করা জরিপ ফলাফলের পর সেখানে ওই অর্থে আর কোনো কার্যক্রম চালানো হয়নি।
বাংলাদেশের লোহার খনি আবিষ্কার ও বিস্তৃত অবস্থান নিয়ে গবেষণা করেন দেশের দুই গবেষক কেএএইচ এম সাইফুর রহমান ও মো. শাহজাহান। বিশ্বব্যাপী গবেষক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের প্লাটফর্ম ‘রিসার্চগেট’-এ তাদের এ গবেষণা প্রতিবেদন ২০২৪ সালের মে মাসে প্রকাশ হয়। ‘জিওফিজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন: লিডিং টু দ্য ডিসকভ্যারি অ্যান্ড ডেলিনিয়েশন অব আয়রন ডিপোজিট অ্যাট চাকুরপাড়া-মসিদপুর এরিয়া, আলিহাট ইউনিয়ন অব হাকিমপুর উপজেলা দিনাজপুর ডিস্ট্রিক্ট, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে লোহার খনি আবিষ্কারের আগে খনির আয়তন সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, লোহার খনি আবিষ্কারের আগে ২০১৩ সালে এলাকাটিতে একাধিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালিত হয়। এসব জরিপে মসিদপুর ও চাকুরপাড়ায় দুটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হয়, যা ধাতব খনিজের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। এরও আগে ২০১২ সালে গ্র্যাভিটি ও ম্যাগনেটিক প্রোফাইলিং জরিপ পরিচালনা করা হয়, যাতে প্রায় ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। জরিপে ছয়টি ম্যাগনেটিক প্রোফাইল ও তিনটি গ্র্যাভিটি প্রোফাইল আওতাভুক্ত করা হয়। ম্যাগনেটিক জরিপে প্রায় ৩৬ লাইন-কিলোমিটার এবং গ্র্যাভিটি জরিপে প্রায় ১২ লাইন-কিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, মসিদপুর ও চাকুরপাড়ায় যে দুটি শক্তিশালী ম্যাগনেটিক অ্যানোমালি শনাক্ত হয় তার মধ্যে মসিদপুর অঞ্চলের অ্যানোমালিটি সবচেয়ে শক্তিশালী। এখানে সর্বোচ্চ চৌম্বকীয় মান পাওয়া যায় ৪৮ হাজার ১৭২ ন্যানোটেসলা। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চারটি ড্রিলহোল খনন করে। এসব ড্রিলহোলে ৪০০ থেকে ৬৩২ মিটার গভীরতায় একাধিক স্তরে লৌহ আকরিক পাওয়া যায়। আকরিক স্তরের পুরুত্ব ৪ দশমিক ৬ মিটার থেকে ১৫৬ মিটার পর্যন্ত ছিল। আকরিকে ৬০-৬৯ শতাংশ পর্যন্ত লৌহ অক্সাইড পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক মূল্যায়নে অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক তথ্য পাওয়া না গেলেও বিস্তৃত জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে আরো ভালো ফলাফল পাওয়ার সুযোগ থাকে। লোহাসহ মূল্যবান যেসব খনিজ পদার্থ পাওয়ার কথা বলেছে জিএসবি, সেই বিষয়টি নিয়ে আরো নানা ধাপে কাজ করার এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ ছিল। বৈশ্বিকভাবে খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোতে এ ধরনের বিস্তৃত কার্যক্রম থাকে। যেটা আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের উত্তরাঞ্চল তথা দিনাজপুর, রংপুর, জয়পুরহাটে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে আছে কয়লা, চুনাপাথর, সাদাবালি, আকরিক লোহা, কাচ বালি ও ধাতব খনিজ। কয়লা রয়েছে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন টন। বৃহৎ চারটি কয়লা খনিতে এ মজুদ থাকা সত্ত্বেও এখনো বড়পুকুরিয়া ছাড়া অন্য কয়লা খনিগুলোতে উত্তোলন কার্যক্রমে যেতে পারেনি পেট্রোবাংলা।
সম্ভাবনাময় খনিজ সম্পদ এলাকায় বিস্তৃত জরিপ করা হলে সেখানে কোনো না কোনো ফলাফল মিলবেই বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো একটি খনিজ সম্পদ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় আর বিশদভাবে জরিপ কিংবা খনন কার্যক্রম অব্যাহত থাকে না। তবে প্রসপেকটিভ বেশি হলে এবং জরিপ এরিয়া বাড়ানো গেলে আরো বেশি সম্ভাবনাময় ডেটা পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে খনিজ এলাকাটির বিষয়ে আরো স্বচ্ছ ও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে কঠিন শিলা বা আকরিক লৌহক্ষেত্র এলাকাটি ছোট। সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় এলাকায় কূপ খনন করে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবুও বলছি না যে সেখানে আরো বেশি জরিপ করার সুযোগ নেই; করা গেলে বেশি ডেটা পাওয়া সম্ভব।’
আলিহাটের ইসবপুরে আবিষ্কৃত ওই লোহার খনির মজুদের হিসাবটি ছিল জিএসবির প্রাথমিক জরিপের। সেই সময় তিন মাস ধরে কূপ খনন করে সেখানে লোহার আকরিক মজুদের তথ্য দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে লোহার খনির প্রকৃত অবস্থা জানতে ২০২২ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন সরকার জার্মান কোম্পানি ডিএমটি কনসালটিংয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করে। বিসিএমসিএলের তত্ত্বাবধানে এ সমীক্ষায় প্রাথমিক সমীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে পরবর্তী সময়ে খনির উন্নয়নে বিশদ গবেষণা চালানো হবে বলে জানানো হয় চুক্তি সই অনুষ্ঠানে। ‘প্রিলিমিনারি স্টাডি ফর ডেভেলপমেন্ট অব আলিহাট আয়রন ওর ডিপোজিট’ শীর্ষক চুক্তিটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়। এ সমীক্ষার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লৌহ আকরিকের মজুদ পর্যাপ্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বলে জানানো হয়।
লোহার খনি জরিপ ও খনন কার্যক্রমে জড়িত থাকা বিসিএমসিএলের এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জিএসবির লোহার খনির মজুদসংক্রান্ত জরিপটি ছিল কনসেপচুয়াল স্টাডি। প্রকৃত মজুদ জানতে সে সময় কূপ খনন প্রয়োজন বলে জানিয়েছিল জিএসবি। কূপ খননও করা হয় বিদেশী প্রতিষ্ঠান দিয়ে। তবে তারা সেখানে ১০ শতাংশ লোহার আকরিক মজুদের কথা জানায়। বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড বিবেচনার ভিত্তিতে অন্তত ৩০ শতাংশ মজুদ না থাকলে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নয় বলে জানায়।
তবে তিনি স্বীকার করেন, জিএসবির কাছে খনি মজুদ সম্পর্কিত যেসব তথ্য-উপাত্ত (কোড) রয়েছে তা দিয়ে প্রাথমিক ফিজিবিলিটি স্টাডি কিংবা আরো বিস্তৃত গবেষণা করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেটা অনেক খরচের ব্যাপার। তবে সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। জার্মান প্রতিষ্ঠানটিকে দিয়ে যে জরিপ করা হয়েছে সেখানে ব্যয় হয়েছে ২৬ কোটি টাকা। তবে আরো বিস্তৃত গবেষণা করতে হলে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে এ ধরনের জরিপ কার্যক্রমে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খনন) মাসুদ রানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোহার খনিটি আবিষ্কৃত হয় ২০১৯ সালে। জিএসবি মূলত প্রকল্প এলাকাটুকুতে (৫০ শতক) জরিপ করার পর ভূমি মালিককে জায়গা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানি নিয়ে খননকাজ করে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক বলেন, ‘গত বছর হাকিমপুরের আলিহাট লৌহ আকরিক খনি নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এ প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেন। তাদের মতে, এ খনি থেকে আকরিক উত্তোলন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই তারা এটি এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে কোনো ইতিবাচক পরামর্শ দেননি।’